সৃজনে মননে কামাল আহমেদ | আনন্দভুবন

কামাল আহমেদ দেশের বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী। দীর্ঘদিন ধরে সংগীতচর্চার মধ্যে দিয়ে তিনি সকল মানুষের বিশেষ করে, সুধিমহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন। বর্তমান প্রজন্মের কাছে তিনি অত্যন্ত সমাদৃত। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি সার্ক সংস্কৃতি সমিতি পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু গবেষণা ফাউন্ডেশন পদক, ফোবানা পুরস্কার, রাজশাহী বেতার শিল্পী সংস্থা পুরস্কার, জাতীয় রবীন্দ্র গবেষণা ও চর্চা কেন্দ্র সম্মাননসহ বেশ কিছু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভ‚ষিত হয়েছেন। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ বেতারের উপমহাপরিচালক [অনুষ্ঠান] হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি কামাল আহমেদ তাঁর কিছু অগ্রন্থিত এবং অপ্রকাশিত কথা বলেছেন আনন্দভুবনের সঙ্গে। আনন্দভুবনের পক্ষ থেকে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন বিশিষ্ট আবৃত্তিশিল্পী ও উপস্থাপক শাহাদাৎ হোসেন নিপু। তাঁদের কথোপকথনের চুম্বক অংশ থাকছে এবারের সারেগারে আয়োজনে…

শাহাদাৎ হোসেন নিপু – শুরুতেই জানতে চাই, আপনি তো অনেকদিন ধরেই রবীন্দ্রসংগীতে মনোনিবেশ করেছেন। সংগীতের প্রতি আপনার প্রথম প্রেম হয়েছে কীভাবে ?

কামাল আহমেদ : সংগীত মানুষের ভেতরে জন্মগতভাবেই থাকে। সেটি বিভিন্ন পরিবেশে তার শাখা-প্রশাখা মেলে এবং আরো প্রস্ফুটিত হয়, বিকশিত হয়। আমার ভেতর জন্মগতভাবেই সংগীত ছিল এবং আমার জন্মটাও কিন্তু সেই নিভৃত পল্লিতে পাবনা জেলায় খোকড়া গ্রামে। আমি সেখানকার দিগন্তবিস্তৃত মাঠে চলাফেরা করতাম। রাখালদের সঙ্গে কথা বলতাম। মাঠের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে যেতে আমি খালি গলায় গান গাইতাম। আমার গান মাঠের কৃষক বা রাখাল যারা থাকতেন সবাই পছন্দ করতেন। অনেকে ডেকে কাছে বসিয়ে গান শুনতেন। আমি প্রাণের সুখে খালি গলায় গান গাইতাম। এটি আমার শুরুর কথা।

শাহাদাৎ হোসেন নিপু – আপনার কথায় বুঝতে পারলাম প্রকৃতিই একটা বড়ো রকমের সহযোগী ছিল সংগীতে প্রবেশ করার ক্ষেত্রে-

কামাল আহমেদ : হ্যাঁ, অকৃত্তিমভাবে নিজের বেড়ে ওঠা, নিজের বিকাশ, সেখানে কোনো বাধা ছিল না। উন্মুক্ত একটা পরিবেশে গান গাওয়ার সুযোগ হয়েছে।

শাহাদাৎ হোসেন নিপু – পারিবারিক সম্পৃক্ততা, পারিবারিক আবহাওয়া নিশ্চয়ই এর সঙ্গে জড়িত ছিল ?

কামাল আহমেদ : এটি ঠিক বিপরীত ছিল। আসলে আমার চর্চা কিন্তু মাঠেই অনেকটা হয়ে যেত। আর আমার প্রাইমারি গাইড ছিল বেতার। আমি ছেলেবেলা থেকেই নিয়মিত বেতারে গান শুনতাম এবং আমার লেখাপড়ার সাথিও ছিল বেতার। ওটা অন করেই আমি পড়তে শুরু করতাম। এবং বেতারে গান শুনে শুনে মুখস্থ করে ফেলতাম। সেই গানগুলোই আমি আমার রাখাল বন্ধুদের নিয়ে গাইতাম।

শাহাদাৎ হোসেন নিপু – সেই সময় কাদের গান আপনার হৃদয় মন ছুঁয়েছে, টেনেছে এবং স্পর্শ করেছে ?

কামাল আহমেদ : আসলে আমাদের যে সময়ে বেড়ে ওঠা, সেই সময়ে বাংলা গানের একটা স্বর্ণযুগ ছিল। কারণ, সেই সময়ে আমরা পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতা যেটাই বলি না কেন, সেখানে অসাধারণ সব শিল্পীরা ছিলেন। আমাদের দেশেও ভালো ভালো শিল্পী ছিলেন, সংগীত পরিচালক ছিলেন সেই সময়ে। আমি দুই বাংলারই গান শুনে বড়ো হয়েছি। রবীন্দ্রনাথের গান বলতে আমাদের এখানে মিতা হক, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, কাদেরী কিবরিয়া, ফাহিম হোসেন চৌধুরী, বুলবুল ইসলাম এদের সবার গান শুনে বড়ো হয়েছি। ঠিক একইভাবে কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গ যেটাই বলি না কেন, সেখানে সুবিনয় রায়, অর্ঘ সেন, সাগর সেন, কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, দেবব্রত বিশ্বাস সবার গান শুনেছি। রবীন্দ্রনাথের গান যেমন আমরা শুনেছি ঠিক একইভাবে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কিশোর কুমার, মান্না দে, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্রের কালজয়ী বাংলা গান এবং আমাদের দেশের মাহমুদুন্নবী, আব্দুল জব্বার, সাবিনা ইয়াসমীন, রুনা লায়লা, শাহনাজ রহমতুল্লাহ সবার গান শুনেই বড়ো হয়েছি। মোট কথা, আমাদের যে বেড়ে ওঠা সেটি হয়েছে একটি সংগীতময় পরিবেশে। তখন সংগীতের একটি স্বর্ণালি যুগ ছিল। অসাধারণ সব গান সৃষ্টি হতো। সেগুলো শুনেই বাংলা গানের যে স্বরূপ সেটা ভেতরে ধারণ করেছি।

শাহাদাৎ হোসেন নিপু – তখন আপনি শৈশব-কৈশোর উত্তীর্ণ একজন বালক। ওই সময়ে আপনাকে সংগীত কীভাবে আকৃষ্ট করল এবং ধীরে ধীরে আপনি কীভাবে রবীন্দ্রনাথকে আশ্রয় করলেন সেটা জানতে চাই-

কামাল আহমেদ : যে বয়সে আমি শৈশব-কৈশোর পার করেছি আমি আগেও বলেছি, সেটা ছিল সংগীতের সোনালি যুগ। সেই সময়ে আমরা বাংলা আধুনিক গান পেয়েছি, রবীন্দ্রনাথের গান পেয়েছি, নজরুলের গান পেয়েছি। এদের গান শুনেই কিন্তু আমরা বড়ো হয়েছি। বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে স্কুল-কলেজের গন্ডি পেরিয়ে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম তখন হঠাৎ চিন্তা করলাম সব গানই আমার ভালো লাগে তবে রবীন্দ্রসংগীত একটু বেশি টানে আমাকে। সেই নিরিখে আমি ‘ছায়ানটে’ প্রথম বর্ষে ভর্তি হলাম। ছায়ানটে আমার শিক্ষাগুরু হিসেবে পেলাম এদেশের রবীন্দ্রচর্চার পথিকৃৎ ওয়াহিদুল হককে। তিনি আমাদের প্রথম বর্ষে শেখালেন, রবীন্দ্রনাথকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। তার গানকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন এবং আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের যে বেড়ে ওঠা সেটিও একই সঙ্গে শুরু হলো। বছরখানেক যেতেই আমি আবিষ্কার করলাম, যে সব ধরনের গান করি ঠিকই কিন্তু আমার জন্য রবীন্দ্রনাথের গান, তখন থেকেই রবীন্দ্রনাথের গানকে ফোকাস করেই আমার পথচলা। তখন থেকেই আমার এই ভাবনা হয়েছে যে, আমি অবশ্যই বাঙালি সংস্কৃতির লালন এবং প্রসারের জন্য কাজ করবই। কিন্তু আমার মূল জায়গা হবে রবীন্দ্রনাথ। তাকে নিয়েই আমি সামনে এগিয়ে যাব এবং তার চাওয়া-পাওয়াকেই আমার চিন্তা-চেতনা, আমার কাজ এবং সংগীতের মাধ্যমেই বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব। সেই নিরিখেই কাজ শুরু করি, করছি এবং ভবিষ্যতেও করব।

শাহাদাৎ হোসেন নিপু – আপনার ভেতরে একটি আদর্শ আপনি বহন করে চলেছেন চেতনায় এবং মননে। একজন শিল্পীর সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গাও আপনার কাছে খুব পরিষ্কার। সে সম্পর্কে যদি কিছু বলেন-

কামাল আহমেদ : রবীন্দ্রনাথ আমার সামনে এগিয়ে যাওয়ার অবলম্বন। আমার ভালো লাগা আমার পথচলা, আমার জীবন আচরণ সবকিছুর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ মিশে আছেন। আমি লক্ষ্য করলাম মোটা দাগে রবীন্দ্রনাথের গানের শিল্পী হলেও একজন নাগরিক হিসেবে আমার অনেক দায়িত্ব আছে। আমি খুব ব্যথিত মনে লক্ষ্য করলাম, যে মহান পুরুষের জন্ম না হলে আমরা এই স্বাধীন ভূখÐ পেতাম না, দেশ পেতাম না। পেতাম না লাল-সবুজের পতাকা। সেই মহান পুরুষ, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে কোনো শিল্পীই সম্পূর্ণ কোনো অ্যালবাম করেননি। আমি যখন প্রথম করি তখন পর্যন্ত কেউই একক অ্যালবাম করেননি। হয়ত একটি দুটি গান করেছে বিক্ষিপ্তভাবে। কিন্তু একটা পরিকল্পনা করে বঙ্গবন্ধুর জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে সবরকমের গান নিয়ে অ্যালবাম- এটি কেউ করেননি। সেইটি আমাকে খুব পীড়া দিল এবং আমি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ১২টি গানের প্রথম অ্যালবামের কাজ শুরু করলাম। নাম দিলাম ‘মহাকাব্যের কবি’। আমি বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে আরো দুটো অ্যালবাম করেছি। একটি ‘মহাকবি’ অন্যটি ‘রাজনীতির কবি’। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমি তিনটি একক অ্যালবাম করেছি। এছাড়া আমি ঐহিত্যবাহী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বেতার নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম ‘ধ্বনির অগ্রপথিক’ বানিয়েছি। আবার বাংলাদেশ বেতারের পক্ষ থেকে আমার গবেষণা, ও নির্দেশনায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ডকুমেন্টারি ফিল্ম ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু’ বানিয়েছি। আমি মনে করি, বঙ্গবন্ধুর ওপর এই ডকুমেন্টারি ফিল্ম আমার জীবনের একটি শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। এটি বাংলা ও ইংরেজি দুটো ভার্সনে হয়েছে। ইংরেজি নাম ‘ফাদার অব দ্য ন্যাশন’। এটি বাংলাদেশ বেতারের একটি গর্বের কাজ।

শাহাদাৎ হোসেন নিপু – ‘মিউজিক অব বেঙ্গল’ নামে একটি ইউটিউব চ্যানেল আছে। সেখানে অনেক মূল্যবান সম্পদ আপনি রাখছেন। এ সম্পর্কে জানতে চাই-

কামাল আহমেদ : আমাদের সংগীতের বিশেষ করে মার্কেটিংয়ের জায়গায় বন্ধ্যাত্ব যাচ্ছে এবং মানসম্পন্ন সংগীত সেটি তার জায়গাটি পাচ্ছে না। এই নিরিখেই আমার ভাবনা হলো যে, বাঙালির চিন্তা-চেতনা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে আমাদের প্রয়াত যেসব দিকপালেরা রয়েছেন, তাদের সৃষ্টি নিয়ে কিছু করা। এছাড়া আমাদের শতবছরের ঐতিহ্য তুলে ধরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নিয়ে আমাদের গর্বের জায়গা রবীন্দ্রনাথ, নজরুল বা বিভিন্ন লোককবি তাদের কাজগুলো নিয়ে পরিশীলিতভাবে একটি প্ল্যাটফর্ম থাকা উচিত। সেই ভাবনা থেকেই ‘মিউজিক অব বেঙ্গল’ সৃষ্টি করা। এর মধ্যে আমি কিছু গর্বের জায়গাও স্পর্শ করেছি। যেমন, আমাদের কালজয়ী কবিতা, সৈয়দ শামসুল হকের ‘আমার পরিচয়’ এটি কবিতা ও গানের মাধ্যমে প্রকাশ করেছি। ঠিক একইভাবে নির্মলেন্দু গুণের ‘স্বাধীনতা এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হল’ এটি আমরা কবিতা ও গানের মাধ্যমে চ্যানেল থেকে প্রকাশ করেছি। শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুিম’ কবিতা ও গানের মাধ্যমে প্রকাশ করেছি। রবীন্দ্রনাথের গান প্রকাশিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যে তিনটি অ্যালবামের কাজ করেছি সেগুলো এবং কিছু মিউজিক ভিডিও এই চ্যানেল থেকে প্রকাশিত হয়েছে। ভবিষ্যতে আরো শিল্পীদের মানসম্পন্ন কাজ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতি নিয়ে যারা কাজ করবেন সেগুলোও এই ব্যানার থেকে প্রকাশিত হবে।

কামাল আহমেদের প্রকাশিত অ্যালবামসমূহঃ
সাদা মেঘের ভেলা, নানা রঙের দিনগুলি, পথ চাওয়াতেই আনন্দ, ফাল্গুনের দিনে, নিঃশব্দ চরণে, গোধূলি, কান পেতে রই, বেঁধেছি আমার প্রাণ, ভরা থাক স্মৃতিসুধায়, নিদ্রাহারা রাতের গান, বালুকা বেলায়, অধরা, গানের তরী, দূরের বন্ধু, একুশের স্বরলিপি, নীল সমুদ্র, মহাকাব্যের কবি, মহাকবি, প্রথম প্রেম, তোমার অসীমে, রাজনীতির কবি, স্মৃতির শহরে, তোমায় গান শোনাব, শ্রাবণঘনগহন মোহে, জন্মভূমি।

অনুলিখন : শহীদুল ইসলাম এমেল

সূত্র: আনন্দভুবন

Scroll to Top